ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শাল-সেগুন আর গজারির বন,
আনারস কলা তার  ধন।
লাল মাটির বন পাহারে ,
ঘন নিবিড় সবুজ অরণ্যে,
হলুদ, কচু সারি সারি।
আছে আদিবাসি নর-নারী।
সকল ধর্মের মিলন মেলা,
মধুপুর উপজেলা।
আম কাঠালে ভরপুর,
এই আমাদের মধুপুর।।

প্রেক্ষাপট:-  স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এর প্রজ্ঞাপন, এস,আর,ও নং-২২২-আইন/৯৫ এর ক্ষমতা বলে টাংগাইল জেলাধীন মধুপুর উপজেলার মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন ২১(একুশ)টি মৌজা ৯.৬৬ বর্গমাইল/২৫.৬২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিযে ১৯৯৫ইং সনের ২৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রানালয়ের মাননীয়  মন্ত্রী মধুপুর পৌরসভা ঘোষনা করেন।প্রতিষ্ঠাকালে এর লোক সংখ্যা ছিল-৩৮৫১৪ জন (পুরুষ-২০০৫০জন+মহিলা-১৮৪৬৪ জন) ভোটার সংখ্যা ছিল ২৪৭১৪ জন(১৩৩৫৫+মহিলা-১১৩৫৯ জন)।ওয়ার্ড সংখ্যা =০৯ টি।বর্তমানে মধুপুর পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ৫৬৬৫৮ জন।
 ১৯৯৯ইং সনের ২৩ ফেব্রুয়ারি তরুন ছাত্র নেতা জনাব মোঃ শহিদুল ইসলাম বিপুল ভোটে নবগঠিত মধুপুর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারনে তিনি ২০০৪ইং সনের ১৪ই মে দ্বিতীয় নির্বাচনে এবং ২০১১ সনের ১৭-জানুয়ারি ৩য় নির্বাচনে মধুপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তার সু-দক্ষ নেতৃত্বে অত্র পৌরসভার উত্তরোত্তর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বিকৃতি স্বরুপ, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়  স্থানীয় সরকার বিভাগ পৌর ৩ শাখার,পৌর-৩/ঢাবি-গ-১৮/৯৫ 'গ' শ্রেনী থেকে 'খ' শ্রেনীতে উন্নীত করেন।

মধুপুরের নামকরন:- ১৮৯৮ সালে মধুপুর থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। মধুপুর এই কথাটি উচ্চারনের সাথে সাথে যে কারোরই মনে পরবে সুমিষ্ট মধু-র কথা। যে মধু নানী-দাদীরা প্রতিটি নবজাতকের মুখে দেন, সন্তান মিষ্টভাষী হবে এই বাসনায়। মধুপুরের সু-বিস্তৃত অরণ্যে, বনে-বাদারে প্রাকৃতিক মধুর প্রাচুর্য ছিল। তrকালে বহু মানুষ বনের মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এই অঞ্চলের মুরুব্বীয়ানদের মুখে শোনা যেত মধুপুর বনে প্রাকৃতিক মৌচাক পরিপক্ক হওয়ার পর মৌচাক থেকে মধু ফোটা ফোটা পরে নিচে পুরত্ব হয়ে যেত। সেগুলো সংগ্রহ করার কেউ ছিলনা । লোক মুখে একথাও প্রচলিত আছে যে, মধুপুরের অরণ্যে এত বেশী প্রাকৃতিক মধু পাওয়া যেত, যা আশে-পাশের থানা- মহকুমার বিত্তশালী গণ সংগ্রহে রেখে ধন্য হতেন।তাই কালের পরিক্রমায় 'মধু; শব্দের সাথে 'পুর' অর্থাৎ নগর/শহর/লোকালয় যুক্ত হয়ে (মধু+পুর) এই অঞ্চলের নামকরন মধুপুর হয়েছে বলে অধিকাংশের ধারনা।

ভৌগলিক অবস্থানঃ- টাঙ্গাইল জেলার সর্ব উত্তরের উপজেলা মধুপুর।অরণ্য বেষ্টিত পাহাড়ী জনপদ মধুপুরের লাল মাটির রয়েছে আলাদা ইতিহাস ও সংস্কৃতি।রয়েছে ভৌগোলিক খ্যাতি।মধুপুর উপজেলা সদর দক্ষিনে টাঙ্গাইল জেলা,পশ্চিমে জামালপুর জেলা এবং উত্তরে ময়মনসিংহ সম দুরত্বে অবস্থিত।মধুপুর সদর থেকে এই তিন জেলার দূরত্ব ৪৫ কি:মি:।টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহা সরকের পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্ব বরাবর মধুপুর উপজেলার ভৌগলিক অবস্থান।এখান থেকে সড়ক পথে দেশের সকল জেলা সদরে যাওয়া যায়।দিনে ও রাতে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সহ দেশের সর্বত্র যাওয়ার বাস/কোচ এখানে পাওয়া যায়।মধুপুর উপজেলার উত্তর সিমানায় মুক্তগাছা ও নান্দিনা উপজেলা দক্ষিনে ঘাটাইল উপজেলা, পূর্বে ফুলবাড়িয়া, পশ্চিমে ধনবাড়ী ও গোপালপুর উপজেলা। মধুপুর উপজেলার মোট আয়তনঃ ৩৭০,৪৭ বর্গ,কি:মি:। লোক সংখ্যা প্রায় ৪.৬০ লক্ষ।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যঃ- অরণ্য বেষ্টিত পাহাড়ী জনপদ মধুপুরের বীর মুক্তযোদ্ধারা বাংলাদেশের স্বাধিনতা সংগ্রামে অগ্রসেনা।তারা সৃষ্টি করেছেন অবিস্মরনীয় গৌরবউজ্জল ইতিহাস।১৯৭১-এর ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষন তথা বাংলার স্বাধিনতার ঘোষনায় দেশের আপামর জনগনের মত মধুপর বাসীকেউ স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রানিত করেছিল।তখন থেকেই মধুপুরের পুন্ডুরা গ্রামের আনসার বাহিনীর সদস্য বেলায়েত মন্ডলের নেতৃত্বে বীর জনতা সশস্ত্র প্রশিক্ষনের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।প্রথম দিকে তাদের সংখ্যা ছিল ২০/২৫ জন।১৯৭১-এর ১৩ই এপ্রিল  পাক হায়েনাদের প্রথম মধুপুর আগমন।১৪-ই এপ্রিল ১৯৭১, বাঙ্গালী  মিলিটারী এম মনসুর অলীর নেতৃত্বে মধুপুরের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ।৩ ঘন্টা স্থায়ী এই যুদ্ধে পাক হায়েনাদের একজন অফিসার মারা যায়।একটি বিকল গাড়ী সহ কিছু অস্ত্র মুক্তি বাহিনীর হস্তগত হয়।মধুপুরের প্রথম মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয় লাভ করে।১৯৭১ সালের ১০-ডিসেম্বর মধুপুর সম্পূর্ন পাক হানাদার মুক্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশে লাল সবুজের পতাকা উড়তে থাকে।
জাতীয় অর্থনীতিতে মধুপুরের অবদান:-  দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে মধুপুর উপজেলার ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জল।এখানে উrপাদিত কলা, আনারস, কাঠাঁল, হলুদ সারা দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

১৯৮৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী মধুপুর গড় অঞ্চলে প্রথম পীরগাছায় অর্থনৈতিক ফসল রাবারের চাষ তথা রাবার বাগান শুরু হয়।বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের আওতায় মধুপুরে রাবার চাষ শুরু হয়।মধুপুররে রাবার বাগানের মোট ভূমির পরিমান ৩০১০ একর।মধুপুরের তিনটি রাবার বাগানের ১।পীরগাছা রাবার বাগান ২।চাঁদপুর রাবার বাগান ৩।কমলাপুর রাবার বাগান থেকে প্রতিবছর প্রয় ২০০০,০০মে:টন রাবার উrপাদন হয় জার বাজার মূল্য প্রায় (তিন লক্ষ টাকা টন হিসাবে) ৬০.০০ কোটি (ষাট কোটি) টাকা ।
ভেষজ চিকিrসায় গাছের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ন।এই বিবেচনায় মধুপুর সদর থেকে ৫ কি: মি: উত্তর-c~‡e© ২০০৩ সালে ৪২.০০ একর জমির উপর বাংলাদেশ সরকার ভেষজ বাগান তৈরী করেন ।এই ভেষজ বাগানের সাথে ৬.১৭একর জমি নিয়ে ২০০৭ সনে সুগন্ধি উrপাদনের অন্যতম প্রাকৃতিক উপাদান   ‘ আগর গাছের বাগান তৈরী করা হয়।

কৃষিতে মধুপুরের অবদান:- কৃষি উন্নয়নে মধুপুরে অবস্থিত BADC (বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরশেন) অগ্রনী ভূমিকা পালন করে চলেছে।১৯৬১ সনরে ১৬ অক্টোবর প্রায় ৫১৭ একর কৃষি জমি নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়।এই প্রতিষ্ঠানে উrপাদিত আন্তর্জাতিক মানের ধান বীজ সারা দেশের কৃষকগণ  ব্যবহার করে ধানের বাম্পার ফলনের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করতে সক্ষম হয়েছে।

শিক্ষা ও সাস্থ্য ক্ষেত্র :- নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারী মধুপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।রানীর পৃষ্ঠপোশকতায় ১৯৩৯ সনরে ২ জানুয়ারি মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী রানী ভবানী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।বর্তমানে এটি মধুপুরের মডেল স্কুল।এছাড়াও মধুপুরে একটি মহাবিদ্যালয়, একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়,একটি কারিগরি কলেজ,একটি গার্লস কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বেলজিয়ামের একটি NGO প্রতিষ্ঠান ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন ১৯৫১ সনে যক্ষা ও কুষ্ঠ রোগ নির্মূল করার জন্য মধুপুরের জলছত্র এলাকায় ৯৫ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।যা অদ্যবদি এই অঞ্চলের মানুষদের বিনামূল্যে যক্ষা ও কুষ্ঠ রোগের বিনামূল্যে চিকিrসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।এই হাসপাতালটি জলছত্র হাসপাতাল নামেই পরিচিত।

জাতীয় উদ্যানঃ- জীব বৈচিত্র সংরক্ষন,শিক্ষা গবেষনা এবং চিত্ত বিনোদনের জন্য মধুপুরের দোখলা নামক স্থানে জাতীয় উদ্যান গঠিত হয়।এই উদ্যানে একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত VIP রেষ্ট হাউজ সহ মোট ৫টি রেষ্ট হাউজ আছে।মধুপুর, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য একটি উপজেলা।১৯৭১ এর ১৮ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবব্ধু তার সহধর্মিনী সহ এই বন বিশ্রামাগারে অবস্থান করেন।এখানে অবস্থান কালে বঙ্গবন্ধু মধুপুরের বনাঞ্চলের সংরক্ষন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন।দোখলার এই বন বিশ্রামাগারটি বাংলাদেশ সংবিধান রচনার সাথেও সংশ্লিষ্ট রয়েছে।এই উদ্যানে ২টি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার আছে।এখানে ৪৫ একর বনভূমিতে “চিত্রা” প্রজাতির প্রায় ২০০ হরিণ নিয়ে একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।
মধুপুর বনঃ-সমতল থেকে ২০-৩০ ফুট উঁচুতে মধুপুর গড় অবস্থিত।১৫৩০ খ্রিঃ হযরত পীর জয়েন শাহ্ (রঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য সুদুর মিশর থেকে বাংলাদেশে তথা ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার রসুলপুরে আগমন করেন এবং তিনি এখানেই ইন্তেকাল করেন। টাংগাইল ময়মনসিংহ মহাসরকের রসুলপুর নামক স্থানে তার মাজার অবস্তিত।তার নামেই প্রথমে এই বনভূমির নাম ছিল জয়েনশাহী গড়।মধুপুর গড়ে অবস্থিত বনভূমির মোট আয়তন ৪৫০০০একর ।এই বিশাল বনভূমির রক্ষনাবেক্ষন ও সুষ্ঠু তদারকির জন্য ৩টি রেন্জ অফিস ও ১০টি বিট অফিস আছে।

মধুপুরের ঐতিহ্য শুধু মধুপুর বাসীর নয়, এই ঐতিহ্য আমদের সারা বাংলাদেশের, বাঙ্গালী জাতির। এ পাহাড়ী বনভূমি বাংলা মাকে করেছে আরোও সমৃদ্ধ।মধুপুর বাসীকে করেছে গর্বিত।

Contact Us

  • ত্রিশাল পৌরসভা
  • +৮৮০ ১৭১১ ৬৮৭১৮৭
  • mayor@trishalpourashava.org